“৯ নভেম্বর ২০১৩, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ৬৩তম জন্মবার্ষিকী। ৯ বছর আগে ২০০৪ সালের ৭ মে মাটি ও শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের পুরোধা আহসান উল্লাহ মাস্টার ঘাতকচক্রের ব্রাশফায়ারে শহীদ হন। তার জন্ম গাজীপুরের সাবেক পূবাইল ইউনিয়নের (গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অধীনে) হায়দরাবাদ গ্রামে। জন্ম তারিখ ৯ নভেম্বর ১৯৫০ সাল। ছাত্রজীবনে তিনি সোচ্চার ছিলেন অসামপ্রদায়িক চেতনায়, সত্য প্রতিষ্ঠায় এবং সব প্রগতিশীল আন্দোলনে।”

আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছেলেবেলা অন্য দশজনের ছেলেবেলার মতোই শুরু হয়। শিশু ও শৈশবে নিবিড় পল্লী প্রকৃতিতে দিন অতিবাহিত করেছেন তিনি। ছয় ভাই-বোন, অনেক বন্ধু-বান্ধবের কলকাকলি এবং হাতছানির মধ্য দিয়ে দিনগুলো কেটেছে তার। আহসান উল্লাহ মাস্টারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের হায়দরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি টঙ্গী হাইস্কুলে ভর্তি হন। তখন থেকেই টঙ্গীতে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে রাজপথে নামে ছাত্রছাত্রীরা। সে সময়ে টঙ্গীতে যে আন্দোলন হয়েছিল সেই আন্দোলনে স্কুল পড়ুয়া ছাত্র আহসান উল্লাহ রাজপথে নেমে পড়েন। অংশগ্রহণ করেন মিছিলে। তখন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। টঙ্গী হাইস্কুল থেকে আহসান উল্লাহ ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত তৎকালীন কায়েদে আজম কলেজে (বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ) একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা যখন রাজপথে, তখনও ভাওয়ালের এই সন্তান আহসান উল্লাহ রাজপথের একজন সাহসী সৈনিক। এই রাজনীতির লড়াকু সৈনিক হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠতে থাকে। তিনি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি চালিয়ে যেতে থাকেন। বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা মিলে আন্দোলন গতি লাভ করে। সে সময়কার উত্তপ্ত টঙ্গীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে যেসব সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় সেগুলোর আয়োজনে যাদের নাম সর্বাগ্রে আসে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তরুণ ছাত্র নেতা আহসান উল্লাহ। সে সময়কার দিনে টঙ্গী, গাছা ও পুবাইল এলাকায় গণআন্দোলনে তিনি অভূতপূর্ব অবদান রাখেন । ১৯৬৮ সালে তথাকথিত আগরতলা মামলায় বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার চক্রান্ত করে। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করার নিমিত্তে টঙ্গী-জয়দেবপুরের জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেই কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন লড়াকু ছাত্রনেতা আহসান উল্লাহ। তিনি কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে ‘মুজিব তহবিল’ এর জন্য প্রতিটি কুপন ১০ পয়সা করে বিক্রয় করে অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য সব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৬৮ সালের গণজোয়ারের সৃষ্টিতে অবদান রাখেন। ছাত্রনেতা আহসান উল্লাহ ১৯৬৯ সালের ছাত্রের ১১ দফার ভিত্তিতে গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। প্রবল গণজোয়ার ও গণঅভ্যুত্থানে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকায় প্রদত্ত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে টঙ্গী থেকে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সঙ্গে আহসান উল্লাহ যোগদান করেন। দশ লাখ লোকের সেই জনসভায় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের সঞ্চয় ছিল শুধু মানুষের ভালোবাসা। আবার ছিল না বৈভব-বিত্ত। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপস করেননি যে ব্যক্তিটি, যিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একজন মানুষ ও রাজনীতিবিদ। সেই ব্যক্তি প্রাণ হারালেন ঘাতকচক্রের হাতে। সেবার দ্বারা ও মহৎ কর্মের মাধ্যমে আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে যে মানুষটি অবদান রেখেছিলেন সংগ্রাম-আন্দোলনে, সে মানুষটি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার প্রমাণ করেছেন মানুষকে ভালোবাসলে, তাদের জন্য কাজ করলে ও জীবন উৎসর্গ করলে মানুষ ভালোবাসায় তার প্রতিদান দেয়।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনে যতবার প্রার্থী হয়েছেন আমাদের জনগণের নেতা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার একটিবারের জন্য হারেননি। জিতেছেন বিপুল ভোটে। জয় করে নিয়েছেন গণমানুষের হৃদয় ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনি ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালের পুবাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার উপজেলা পদ্ধতি বিলোপ করে দেয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উপজেলা চেয়ারম্যানদের নিয়ে আহসান উল্লাহ মাস্টার দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এজন্য তিনি জেল, জুলুম এবং নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। উপজেলা বিলোপের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। তারই বিজয় আজ দেশে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব ফল হিসেবে বিরাজ করছে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন, পেশাগত ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ করার দাবি নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন প্রতিনিয়ত। দেশে যখন ত্রাস ও গ্রাসের রাজনীতির বলয় তৈরি হয়েছে তখনই শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে দেখা গিয়েছে টঙ্গীর রাজপথে এবং ঢাকার রাজপথে। তিনি ১৯৮৩ সাল, ১৯৮৪ সাল, ১৯৮৭ সাল, ১৯৮৮ সাল ও ১৯৯০ সাল, ১৯৯৫ সাল, ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পটভূমিতে শ্রমজীবী নেতা হিসেবে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা গর্ব করার মতো।

২০০১ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি বস্ত্র শিল্পের মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে মিলগুলো বেসরকারিকরণে যে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনে যার অক্লান্ত পরিশ্রম বাস্তবে কাজে লেগেছে, তিনি হচ্ছেন শ্রমিকদের পরীক্ষিত নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার। শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের প্রশ্নে কোনদিন আপস করেননি। শ্রমিক অসন্তোষ যেখানে দেখা দিয়েছে, সেখানেই নিজে ছুটে গিয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষের সময় খেয়াল রেখেছেন শ্রমিক কেউ অসন্তোষকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে নিজের ফয়দা হাসিল না করতে পারে। দর কষাকষির মাধ্যমে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন করার নিরন্তর চেষ্টাকে তাকে সফল নেতায় পরিণত করেছে। প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে বন্ধ ও রুগ্ণ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নেয়া, পাটসহ জাতীয় শিল্প রক্ষা ও কৃষকদের স্বার্থে কাঁচা পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাসহ শ্রমিক-কৃষকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেছেন ভাওয়ালের এই কৃতী সন্তান শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা, নারী শ্রমিক স্বার্থ সংবলিত দাবি বাস্তবায়ন ও বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মজুরি ও বেতন-ভাতা নির্ধারণ করার জন্য দেশের নীতিনির্ধারণী মহলের সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত শতকের আশির দশকে গঠিত শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার জন্য শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। তিনি আইএলও কনভেনশন ‘৮৭ ও ‘৯৮ এর ভিত্তিতে শ্রম আইন সংশোধনের দাবি করেছেন।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন দশের মধ্যে একক। তাকে মানুষ ভক্তি করতেন, তিনিও মানুষকে ভক্তি করতেন। স্বাতন্ত্র্যে ও বৈশিষ্ট্যে আর দশজন থেকে তাকে পৃথক করা যায় এবং তিনি দীপ্যমান হয়ে উঠেন জ্যোতির্ময় সূর্যের মতো। সবার প্রিয় শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন সর্বস্তরের মানুষের গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনগণমন অধিনায়ক। দেশ ও মানুষের জন্য তিনি কাজ করেছেন এবং জীবন উৎসর্গ করেছেন। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার বহুমুখী প্রতিভা ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এ রকম ব্যক্তিকে বাংলার মাটিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ২০০৪ সালের ৭ মে, শুক্রবার। দেশ হারায় জনগণমননন্দিত অধিনায়ককে, যিনি ছিলেন সহস্র তরুণের আদর্শ, যিনি ছিলেন জনকল্যাণমুখী চিন্তাধারার একজন রাজনীতিবিদ ও একজন মানুষ গড়ার কারিগর। বীর মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহ মাস্টার একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় মরেননি; যুদ্ধ করেন দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। সেই পাকিস্তানি বাহিনী তাকে হত্যা করতে পারেনি। তাকে হত্যা করে স্বাধীন দেশের মাটিতে ঘাতকচক্র।

লেখক : মো. মুজিবুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক

কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ, গাজীপুর